৭ই মার্চ, ১৯৭১

ঢাকার রাজপথে স্বাধিকারকামী জনতার দৃপ্ত পদচারণা কন্ঠে কন্ঠে ক্ষুব্ধ গর্জন, প্রাণে প্রাণে সংগ্রামী শপথ—মোহাম্মদ ওমর ফারুক দেওয়ান

প্রকাশিত : ৭ মার্চ ২০২১

প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান ১লা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। ৩রা মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন হওয়ার কথা ছিল। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণার পর বাংলায় তো বটেই পশ্চিম পাকিস্তানের দলগুলো এবং সাধারণ জনগণ বিক্ষোভে ফুঁসে উঠলো। প্রেসিডেন্ট বুঝতে পারলেন যে, বাংলার মানুষকে অস্ত্রের মুখে দাবিয়ে রাখা যাবে না। পিপল্স পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী ছাড়া পাকিস্তানের সকল দল ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন শুরু করলো। বিশেষত: বাংলাদেশে যেন তপ্ত পিন্ডে পরিণত হলো। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ৭ই মার্চ জনসভার ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন। সে জনসভায় তিনি কি বলেন, এক তরফা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে বসেন কিনা, এসব শংকা প্রেসিডেন্টের ছিল। ইতোমধ্যে তিনি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে যে বৈঠকের ডাক দিয়েছিলেন, বঙ্গবন্ধু তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। ৭ই মার্চের শংকা থেকেই আমার ব্যক্তিগত বিবেচনা ঠিক আগের দিন প্রেসিডেন্ট জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ঘোষণা করেন। এর ফলে, যদি বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের জনসভায় স্বাধীনতার ঘোষণা দেন, প্রেসিডেন্ট বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বলে বিশ্বে উপস্থাপন করতে পারবেন। ৭ই মার্চ দৈনিক ইত্তেফাক নিম্নলিখিত সংবাদগুলো পরিবেশন করে-
২৫শে মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান
আওয়ামী লীগ কমিটির জরুরী বৈঠক

গতকাল (শনিবার) ঢাকায় দলীয় প্রধান শেখ মুজিবর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও বাংলা দেশ শাখার ওয়ার্কিং কমিটির এক যুক্ত জরুরী বৈঠকে দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া গতকাল দুপুরে আগামী ২৫শে মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করিয়া বেতার ভাষণ দানের অব্যবহিত পরেই শেখ সাহেবের বাসভবনে এই বৈঠক শুরু হয় এবং রাত্রি পর্যন্ত কয়েক ঘন্টা চলার পর ইহা মুলতবী হইয়া যায়। বৈঠকে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, জনাব কামরুজ্জামান, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, খোন্দকার মোস্তাক আহমদ ও জনাব তাজুদ্দিন আহমদসহ গতকাল ঢাকা শহরে অবস্থানরত দলীয় ওয়ার্কিং কমিটির সকল সদস্যই যোগদান করেন। শেখ সাহেব গতকাল দুপুরে স্বীয় বাসভবনে বসিয়া বেতারে প্রেসিডেন্টের ভাষণ শ্রবণ করেন। বেতার ঘোষণার অব্যবহিত পরেই তিনি দলের উভয় ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যদের এক জরুরী বৈঠকে আহ্বান করেন। রুদ্ধদ্বার কক্ষে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে প্রেসিডেন্টের বেতার ভাষণের আলোকে দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকের সিদ্ধান্ত বা প্রেসিডেন্টের বেতার ভাষণ সম্পর্কে শেখ মুজিবের প্রতিক্রিয়া কোনটাই গভীর রাত্রে এই রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত সাংবাদিকদের জানানো হয় নাই। তবে আশা করা যাইতেছে যে, শেখ সাহেব আজ (রবিবার) দুপুরে রেসকোর্সের গণসমাবেশে ভাষণ দানকালে বাংলাদেশের জনগণের উদ্দেশে তাঁহার বক্তব্য পেশ করিবেন।
ঢাকার রাজপথে স্বাধিকারকামী জনতার দৃপ্ত পদচারণা
কন্ঠে কন্ঠে ক্ষুব্ধ গর্জন, প্রাণে প্রাণে সংগ্রামী শপথ

সংগ্রামী বাংলা যেন এক বিক্ষুব্ধ সমুদ্র-এক অন্তহীন সভা-সমাবেশ-মিছিলের দেশ। দিকে দিকে স্বাধিকারকামী জনতার দৃপ্ত পদচারণা-কন্ঠে কন্ঠে উত্তাল সাগরের ক্ষুব্ধ গর্জন, প্রাণে প্রাণে সংগ্রামী শপথ আর বাতাসে বাতাসে জাগ্রত গণশক্তির হৃদয়সঙ্গীত ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়।’
বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ডাকে গতকালও (শনিবার) রাজধানী ঢাকাসহ সমগ্র বাংলাদেশে সর্বাত্মক হরতাল পালিত হয়। আর রাজপথে-জনপদে নামিয়া আসে স্বাধিকারকামী জনতার অগণিত মিছিল, অনুষ্ঠিত হয় অসংখ্য সভা-সমাবেশ। সেই সব সভা-সমাবেশের প্রস্তাবে মিছিলকারীদের শ্লোগানে শ্লোগানে একটি কথাই বার বার ঝঙ্কার হইয়া উঠে ‘যদি চাও রক্ত নেবে, তবু স্বাধিকার দিতেই হবে।’ রাজধানী ঢাকায় গতকাল পঞ্চম দিবসের মত হরতাল পালিত হয়। সারাদিন ধরিয়া শহরে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজিত থাকে এবং হরতালের পরে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা পুনরায় শুরু হয়। গতকালও বেলা আড়াইটা হইতে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ব্যাঙ্কসমূহ এবং যেসব সরকারী বেসরকারী অফিসের কর্মচারীরা এখনও বেতন পান নাই, সেগুলি চালু থাকে। গতকালও সকাল হইতেই রাজপথে জনতার গ্রোতে নামিয়া আসে। সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে সভা-সমাবেশ মিছিল। ঢাকায় গতকাল আওয়ামী লীগের মহিলা শাখার উদ্যোগে এক বিরাট মহিলা শোভাযাত্রা বাহির করা হয়। সন্ধ্যায় ছাত্র-লীগের উদ্যোগে এক বিরাট মশাল শোভাযাত্রা বাহির হয়। ইহা ছাড়া পেশাদার সাংবাদিকদের উদ্যোগে সভা ও মিছিল, মাধ্যমিক শিক্ষকদের উদ্যোগে মিছিল, শিল্পীদের উদ্যোগে সমাবেশ ও মিছিল, ছাত্র ইউনিয়নের (মতিয়া গ্রুপ) উদ্যোগে মিছিল, গণ-শিল্পী গোষ্ঠীর উদ্যোগে মিছিল, বাংলা ন্যাশনাল লীগের উদ্যোগে জনসভা ও মিছিল এবং ফরোয়ার্ড ষ্টুডেন্টস ব্লকের উদ্যোগে মিছিলের আয়োজন করা হয়।

জাতির উদ্দেশে প্রেসিডেন্টের বেতার ভাষণ

প্রেসিডেন্ট জেনারেল এ. এম. ইয়াহিয়া খান আজ দুপুরে রাওয়ালপিন্ডিতে তাঁহার বেতার ভাষণে আগামী ২৫শে মার্চ জাতীয় পরিষদের উদ্ধোধনী অধিবেশন আহ্বানের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। জাতির উদ্দেশে সাড়ে ১২ মিনিটব্যাপী ভাষণে প্রেসিডেন্ট ইহা পরিষ্কারভাবে বলেন যে, যাহাই ঘটুক না কেন, যতদিন পর্যন্ত পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আমার হুকুমে রহিয়াছে এবং আমি পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান রহিয়াছি ততদিন পর্যন্ত আমি পূর্ণাঙ্গ ও নিরংকুশভাবে পাকিস্তানের সংহতির নিশ্চয়তা বিধান করিব। এই প্রশ্নে কাহারো যেন সন্দেহ বা ভুল ধারণা না থাকে।
প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন: “এই দেশকে রক্ষার জন্য পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের কোটি কোটি বাসিন্দার নিকট তাঁহার দায়িত্ব রহিয়াছে। তাঁহারা আমার নিকট হইতে ইহা আশা করেন এবং আমি তাঁহাদের হতাশ করিব না।”………
ওইদিন আরো অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ পরিবেশিত হয়। বিশেষত দৈনিক ইত্তেফাকের বাইরে দৈনিক আজাদ, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক পূর্বদেশ ইত্যাদি পত্রিকার শিরোনাম ছিল আরো যুদ্ধংদেহী।
সুর খান বলেনঃ
‘আইনতঃ শেখ মুজিবই দেশের শাসন পরিচালনার অধিকারী’
প্রেসিডেন্টের মন্তব্যে দুঃখ প্রকাশঃ অবিলম্বে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রতিবন্ধকতা দূর করার আহ্বান

বিশিষ্ট কাউন্সিল মুসলিম লীগ নেতা এয়ার মাশাল (অবসরপ্রাপ্ত) নুর খান আজ লাহোরে বলেন যে, শেখ মুজিবর রহমানের দেশ শাসনের বৈধ অধিকার রহিয়াছে এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাপারে সকল বাধা অবিলম্বে দূর করিতে হইবে। ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র এবং রাজনৈতকি কর্মীদের এক বিরাট সমাবেশে জনাব নুর খান বলেন যে, পরিষদ কক্ষে ৬-দফা সংক্রান্ত সকল বিরোধের মোটামুটি নিষ্পত্তি সম্ভব বলিয়া তিনি বিশ্বাস করেন।
প্রেসিডেন্ট তাঁহার বেতার ভাষণে পরিস্থিতির অবনতির জন্য শেখ মুজিবর রহমানের উপর দোষারোপ করায় জনাব নূর খান দুঃখ প্রকাশ করেন।

এই গণহতা বন্ধ কর
(সম্পাদকীয়) শুক্রবার রাজধানী ঢাকা হইতে সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফেরত পাঠানো হইয়াছে। এই ঘোষণায় যাঁহারা স্বস্তির আশা করিয়াছিলেন তাঁহাদের আশাকে পরমুহূর্তেই টঙ্গীর রক্তাক্ত ঘটনা সর্বাংশে মিথ্যা প্রমাণিত করিয়াছে- টঙ্গীর গোলাগুলীতে চারজন নিহত ও চৌদ্দজনের আহত হওয়ার প্রাথমিক খবর প্রচারিত হইলেও হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা অজ্ঞাত। হতাহতের সঠিক সংখ্যা অবশ্য বাংলাদেশের কোন স্থান হইতেই এ-যাবৎ পাওয়া যায় নাই। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশালী, রংপুর, সিলেট ও অন্যান্য স্থান হইতে নানা ধরনের খবরই আসিতেছে।
গতকল্য খুলনা হইতে টেলিফোনে আমাদের কাছে সংবাদ আসিয়াছে যে, সেখানে অন্যূন ১৭ জন নিহত হইয়াছে। ঢাকার একটি কাগজে বলা হইয়াছে যে, গত শুক্রবার পর্যন্ত ‘গুলী ও ছুরিকাঘাতে কমপক্ষে ১৮৮ জন মারা গিয়াছে।’ অপর একটি কাগজে খবর প্রচারিত হইয়াছে যে, গত ৪ঠা মার্চ পর্যন্ত কেবল চট্টগ্রামেই গোলাগুলী ও ছুরিকাঘাতে নিহতের সংখ্যা ২২২-এ উঠিয়াছে। বস্তুত: পূর্ণাঙ্গ বিবরণ কোথাও হইতেই আসিতে পারিতেছে না। তবে একটা বিষয় সুষ্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে যে, এত অল্প সময়ে এত অধিক প্রাণনাশ ইতিপূর্বে এদেশে কোন আন্দোলন বা হাঙ্গামার কালেই সংঘটিত হয় নাই। এ যেন রীতিমত একটা যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি।………..
এই জটিল পরিস্থিতির সমাধান কোথায়?

(উপসম্পদকীয়) আবুল মনসুর আহমদ ঃ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার উপদেষ্টরা আবার তাঁকে ভুল উপদেশ দিয়াছেন। এবারের ভুলটা সাংঘাতিক মারাত্মক। প্রেসিডেন্টকে এই উপদেশ যাহারা দিয়াছেন, তাঁরা ভুলিয়া গিয়াছিলেন যে, প্রেসিডেন্ট পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান উভয়টারই প্রেসিডেন্ট, শুধু পশ্চিম পাকিস্তানে প্রেসিডেন্ট নন। তাঁরা এও ভুলিয়া গিয়াছিলেন যে, তাঁদের এই উপদেশ আইন-কানুন, নিয়মতন্ত্র ন্যায়নীতি এমনকি খোদ এল এফ ও-বিরোধী। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া উপদেষ্টাদের এই মারাত্মক অপরিণামদর্শী উপদেশ মানিয়া লইয়া নিজেই নিজের ঘোষিত এল এফ ও-র খেলাফ কাজ করিয়াছেন। এই খেলাফটা ঘটিয়াছে এল এফ ও-র মূলনীতি ও কার্যবিধি উভয় দিক হইতেই। তাছাড়া প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক এ্যাপ্রোচেরও বিরোধী হইয়াছে তাঁর এই কাজটি।……
মহিলা আওয়ামী লীগের সমাবেশ ও মিছিল

স্বাধিকার অর্জনের আন্দোলনে বঞ্চিত বাংলার নারী সমাজও বাঁশের লাঠি, লোহার রড এবং কালো পতাকাসহ পুরুষদের পাশে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে। স্বাধিকার অর্জনের দাবীতে এবং গণহত্যার প্রতিবাদে নারী সমাজও রাস্তায় মিছিল করিয়া পুরুষদের সহিত কন্ঠ মিলাইয়া বলিষ্ঠ আওয়াজ তুলিয়াছেন বাংলা স্বাধিকার চাই-ই চাই। আওয়ামী লীগের মহিলা শাখার উদ্যোগে আজ অপরাহ্নে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বেগম বদরুন্নেছা আহমদের সভানেত্রীত্বে এক মহিলা সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
পল্টনে ন্যাশনাল লীগের জনসভা

গতকাল (শনিবার) বিকালে পল্টন ময়দানে বাংলা ন্যাশনাল লীগের উদ্যোগে আয়োজিত এক সভায় স্বাধিকার ও সার্বভৌমত্ব ও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার নিশ্চয়তা সম্বলিত একটি শাসনতন্ত্র ঘোষণা এবং উহা বানচালের প্রচেষ্টা প্রতিহত করার জন্য স্বধিকারকামী সকল রাজনৈতিক দলের ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট গঠনের জন্য বাংলাদেশ হইতে নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
জনাব অলি আহাদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই জনসভায় সভাপতি নিজে দেওয়ান সিরাজুল হক, জনাব আনোয়ারুল ইসলাম বক্তৃতা করেন।
শিল্পী সমাজের বিক্ষোভ

গতকাল (শনিবার) বাংলা একাডেমীর উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত এক সভায় বাংলা দেশের বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ স্বাধিকার আদায়ের জন্য যে-কোন ত্যাগ স্বীকারের শপথ গ্রহণ করেন।
এইদিন বাংলা একাডেমীর বিশাল বটবৃক্ষের নীচে যেন এক তারার মেলা বসিয়াছিল।
লায়লা আর্জুমান্দ বানুর সভানেত্রীত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় প্রধান বক্তা ছিলেন বাংলার পটুয়া জনাব কামরুল হাসান। তিনি তাঁহার বক্তৃতায় বলেন যে, বাংলা দেশের স্বাধিকার আন্দোলনে শিল্পীরাও এক বলিষ্ঠ ভূমিকা গ্রহণ করিতে পারেন।
চিত্রাভিনেতা মোস্তফা তাঁহার ভাষণে বাংলা দেশের স্বাধিকার আন্দোলন সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সর্বশেষ মন্তব্যকে ‘অপমানজনক’ বলিয়া বর্ণনা করেন।
মহিলা পরিষদের সমাবেশ ও মিছিল

এইদিন বেলা ৩টায় বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে মহিলা পরিষদের পক্ষ হইতে সংগঠনের সভানেত্রী বেগম সুফিয়া কামালের সভানেত্রীত্বে অনুষ্ঠিত এক মহিলা সমাবেশে স্বাধিকার আন্দোলনকে জোরদার করার উদ্দেশ্যে ঐক্যবন্ধ কর্মসূচী নেওয়ার জন্য সকল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল, ছাত্র এবং শ্রমিক প্রতিষ্টানসমূহকে ঐক্যবন্ধ কর্মসূচী গ্রহণের আহ্বান জানান হয়। প্রেসিডেন্টের বেতার ভাষণে বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনকে ‘লুঠতরাজ ও দুষ্কৃতিকারীদের’ কাজ বলিয়া অভিহিত করায় সমাবেশে উহার নিন্দা করা হয়। সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ, ডাকসুর সহ-সভাপতি আ. স. ম. আবদুর রব, সাধারণ সম্পাদক আবদুল কুদ্দুস মাখনের নেতৃত্বে এই দীর্ঘ মশাল মিছিলটি জিন্নাহ এভিনিউ, ডি,আই,টি এভিনিউ, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা, কমলাপুর, মালীবাগ হইয়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়া সমাপ্ত হয়।
মাধ্যমিক শিক্ষকদের সমাবেশ ও মিছিল

মাধ্যমিক শিক্ষকদের পক্ষ হইতে গতকাল বিকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত এক শিক্ষক সমাবেশে বর্তমান স্বাধিকার আন্দোলনের সহিত বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজের একাত্মতা প্রকাশ করা হয়। মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাতীয় পরিষদ সদস্য জনাব কামরুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে হেনা দাস, জয়নাল আবেদীন চৌধুরী প্রমুখ বাংলা গণমানুষের রায় বানচালের চক্রান্ত এবং নিরস্ত্র জনতার উপর গুলীবর্ষণের নিন্দা করিয়া বক্তৃতা করেন। সভায় স্বাধিকার আন্দোলন চালাইয়া যাওয়ার জন্য শপথ গ্রহণ করা হয়। সভাশেষে শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ মিছিল করিয়া বায়তুল মোকাররম গমন করেন।
শেখ মুজিবের ভাষণ রীলে করার দাবী

ছাত্রলীগ সভাপতি নুরে আলম সিদ্দিকী ও সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ এবং ডাকসুর সহ-সভাপতি আ. স. ম. আবদুর রব ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুস মাখন গতকাল (শনিবার) সংবাদপত্রে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে আওয়ামী লীগ প্রধান শেক মুজিবুর রহমান আজ রেসকোর্স ময়দানে যে ভাষণ দান করিবেন উহা বাংলা দেশের সকল বেতার কেন্দ্র হইতে রীলে করার আহ্বান জানাইয়াছেন।
লাহোরে আওয়ামী লীগ নেতাসহ ১৫ ব্যক্তি গ্রেফতার

৫ই মার্চ অপরাহ্নে নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি জনাব বি. এ. সলিমী, পাঞ্জাব প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাবহামিদ সরফরাজ, কবি হাবিব জালিব প্রমুখ ১৫ জনকে লাহোরে গ্রেফতার করা হয়।
গভর্নর পদে লেঃ জেঃ টিক্কা খান

প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন পরিচালক জেনারেল ইয়াহিয়া খান লেঃ জেনারেল টিক্কা খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিযুক্ত করিয়াছেন।

৭ই মার্চে দৈনিক আজাদ পত্রিকার সংবাদের শিরোনামগুলো ছিল নিম্নরূপ
ক) জুলুমের জিঞ্জির ভাঙ্গবোই
খ) সংগ্রামের সাথে সাংবাদিকদের
গ) সংগ্রামের কর্মসূচি ঘোষণার জন্য বঙ্গবন্ধুর প্রতি আহ্বান
ঘ) মহিলাদের বিক্ষোভ মিছিল
ঙ) স্বাধিকার সংগ্রামে শিক্ষকরা একাত্ম থাকিবে
চ) ছাত্রসভায় সংগ্রাম অব্যাহত রাখার আহ্বান
ছ) পাঁচটি জোনে নয়া সহকারী সামরিক আইন প্রশাসক
দৈনিক সংবাদ নিরীক্ষণে দেখা যায় প্রায় একই শিরোনামে সংবাদ পরিবেশিত হয়েছে।
লেখকঃ পরিচালক, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)

আপনার মতামত লিখুন :